খিস্তি সুখের উল্লাসে- নীলাদ্রি


একদম ছোটবেলা থেকেই ছড়ার কোলে মানুষ হয়েছি আমরা সেইসব সহজ, প্রাণোচ্ছল এবং প্রায়শই মজার মজার ছড়াগুলো ছিল আমাদের বাইবেল, কোরান, বেদ সবকিছু যখন নিজে পড়তে শিখিনি, তখনই মা, জেঠিমাদের মুখ থেকে শুনে শুনে মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল 'ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি' বা 'আয় আয় চাঁদমামা' ধরণের ছড়াগুলো এরপর একে একে 'তাই তাই তাই/ মামাবাড়ি যাই' বা 'বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর'-এর মতো ছড়া এক নিঃশ্বাসে বলতে শিখি তাছাড়া বাড়িতে কোনো আত্মীয় এলে মা বাবা দাদু দিদাদের গর্বিত করার জন্য তারস্বরে চেঁচিয়ে 'আতা গাছে তোতা পাখি' থেকে শুরু করে 'ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ' কিংবা 'খোকা গেল মাছ ধরতে' পারফর্ম করতে হতো!


ছড়া আমাদের লোকসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবিভক্ত বাংলার প্রত্যন্ত সব এলাকা থেকে অজস্র ছড়া সংগ্রহ করেছিলেন ছোটবেলায় পড়া ছড়াগুলো নিয়ে তিনি শিশুর মতোই উচ্ছ্বসিত ছিলেন আর তাঁর নিজের লেখা প্রতিটি ছড়াই যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ছড়াগুলোর অন্যতম, তা বলাই বাহুল্য একদম ছোটবেলায় পড়া 'সহজপাঠ' বইতে এইসব ছড়া আর নন্দলাল বসুর আঁকা ছবিগুলো আমাদের হাত ধরে নিয়ে যেতো কোন দূর কল্পনার দেশে... বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন,
"যে বয়সে ক-খ চিনলেই যথেষ্ট, সেই বয়সেই সাহিত্য রসে দীক্ষা দেয় 'সহজপাঠ' এই একটি বইয়ের জন্য বাঙালি শিশুর ভাগ্যকে জগতের ঈর্ষাযোগ্য বলে মনে করি"
এছাড়াও ছিলেন সুকুমার রায় পাগলের মতো ভালোবাসতাম তাঁর প্রতিটা ছড়া, লিমেরিক বড়ো হয়ে নতুন করে সেগুলো পড়তে গিয়ে দেখেছি, সেইসব 'ননসেন্স রাইটিং'-এর মধ্যেও রয়েছে আরো কত অসংখ্য মাত্রা, অজস্র তল! এখন ভাবতেও অবাক লাগে, একজন মানুষ কতটা প্রতিভাবান হলে একই লেখার পরতে পরতে বুনে দিতে পারেন এরকম বহুস্তরীয় সম্ভাবনার উৎস!

                    2

তবে এতক্ষণ পর্যন্ত যা আলোচিত হল, সবই ছিল শিষ্ট ছড়ার প্রসঙ্গ কিন্তু এসবের বাইরেও আমাদের শৈশবে, কৈশোরে এমন অনেক ছড়া ছিল, যেগুলো 'মান্য ভাষা'-র অন্তর্গত তো নয়ই; বরং অনেক ক্ষেত্রেই কোনো কোনোটা রীতিমত অশ্লীলতার দায়ে দুষ্ট হয়ে পহলাজদের হাতে কাচি হবার মতো! সব ছড়াই যে ভালগার হতো, তা নয়; তবে অধিকাংশই ছিল নিম্নরুচির

যখন স্কুলে ভর্তি হলাম, তখন দেখলাম মাত্র একটা ছড়ার সৌজন্যে প্রতিটা ক্লাসকে আলাদা করে চেনা যায়! ছড়াটা ছিল এইরকম-
'ক্লাস ওয়ান- পায়খানার দারোয়ান
ক্লাস টু- খায় গু
ক্লাস থ্রি- খায় বিড়ি
ক্লাস ফোর- জুতা চোর


ক্লাস ফাইভ - গুয়ের পাইপ'
এখন বুঝি, যে বা যারা এর সৃষ্টিকর্তা, তাদের কাছে স্কুলটা কতটা বিরক্তিকর জায়গা ছিল সেইসময় যাই হোক, পাটকেলটি খেতে হবে জেনেও অন্য ক্লাসের ছেলেদের কখনো জুতো চুরি, কখনো বা বিড়ি খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতাম...


আমরা স্কুলে যেতাম রিকসাভ্যানে করে সাইকেলে যাওয়া ছেলেরা বাইরে থেকে আওয়াজ দিত- 'মুরগির খাঁচা'! সেইসব ভ্যানে ভ্যানে আবার মাঝে মাঝে রেষারেষি হতো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবশ্য প্ররোচনা থাকতো আমাদের দিক থেকে সমানে 'ভ্যানকাকু'-কে উত্যক্ত করতাম, "ও কাকু ওই ভ্যানটাকে হারাও না, ও কাকু..." কাকুর যদি মুড ভালো থাকতো তাহলে প্যাডেলে চাপ পড়তো আরো জোরে আর মজার ব্যাপারটা হলো, যে ভ্যানটা এই গ্রাঁ-পি তে পিছিয়ে পড়তো, সেই ভ্যানের ছেলেমেয়েরা তারস্বরে ছড়া কাটতো,
"আগে গেলে বাঘে খায়/ পিছে গেলে সোনা পায়"

হেরোদের এই জাতীয় অ্যান্থেম গাওয়া ছেলেমেয়েরা আজ কতটা বাপী লাহিড়ী হতে পেরেছে, তা অবিশ্যি জানি না!


স্কুলের গেটে ফুচকাওয়ালা, আইসক্রিমওয়ালার পাশাপাশি একজন বসতো পেপসি নিয়ে পেপসি মানে, যে মাল্টিন্যাশনাল বোতল হাতে নিয়ে শাহরুখ খান দাঁত কেলিয়ে সবাইকে গিলতে বলে, সেই পেপসি নয় অবশ্য এটা নেহাতই প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়া একখান মিষ্টি বরফের টুকরো বিভিন্ন রঙের পাওয়া যেতো সাদা, কালো, আর কমলাগুলো বেশি বিক্রি হতো মনে আছে জলপাইগুড়ির বিচ্ছু ছেলেরা সেখানকার নিজস্ব উপভাষায় এই পেপসিওয়ালাকে দেখলেই বলতো-

"পেপC, তোর বউকে দেখC"

পেপসিওয়ালাও কম যেতো না ব্যবসার এথিক্স ভুলে সেও পাল্টা ছড়া কাটতো-
"হাইগে ছোঁচে না/ তোরে পেপC দিমু না"



আর কিছু মজার মজার ছড়া তৈরি হতো পদবি নিয়ে চক্রবর্তীদের শোনানো হতো-
"চক্রবর্তী বক্রবান/ জল খাবি তো মালুই আন"! সরকারদের ছেলে অনিকেতকে নাজেহাল করা হতো এইভাবে-
"অনিকেত সরকার/ গাছে ওঠা দরকার/ গাছ থেকে পড়ে গেলে/ কে আনবে ডাক্তার?"
তেমনি কাঞ্চনকে বলা হতো-
"কাঞ্চন দত্ত/ হেগে করে গত্ত/ গত্ততে ঢোরা সাপ/ কাঞ্চা বলে বাপরে বাপ!"
আমার নিয়োগী পদবি নিয়ে অবশ্য কেউ কবিত্ব ফলাতে পারেনি!


মনে আছে স্কুলের ছোট ছোট বেঞ্চগুলোতে তিনজন করে বসা হতো যে মাঝখানে বসতো, সে রাজার মতো বসে ছড়া কাটতো-
"দুই ধারে দুই কলাগাছ/ মধ্যিখানে মহারাজ"
আবার দুপাশের ছেলেরাই বা কম যায় নাকি? তারা পাল্টা জবাব দিত-
"দুই ধারে দুই সেফটিপিন/ মধ্যিখানে গুয়ের টিন"!

এইসব আপাত অর্থহীন কিন্তু গভীর মজার ছড়াগুলো নিয়ে একসময় অসম্ভব আনন্দ পেতাম! আজ ভাবলেই হাসি পায়! দিনগুলো অবধারিত মনে পড়ে যায়
এই সেদিনই যেমন রাস্তায় একজন পুলিশ সার্জেন্টকে এক লড়িচালকের উপর মেজেজ করতে দেখে ছোটবেলার মতোই গুনগুন করে উঠলাম- "বন্দেমাতরম/ পুলিশের টিক্কি গরম!"...

শেষ করবো এইরকমই আর একটা দেশাত্মবোধক ছড়া দিয়ে সেখানে আবার রূপকের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, বেকার সমস্যা, আবার সেসব নিয়ে বিদ্বজনেদের চিন্তায় ঘুম উড়ে যাওয়া, প্রভৃতি গম্ভীর বিষয়ের ছায়াপাত ঘটেছে বলে মনে হয়! ছড়াটা ছিল এইরকম-
"সারে জাঁহাসে আচ্ছা/ ছাগলের পঁচিশটা বাচ্চা/ তাই দেখে গরুর কী লজ্জা!"

গভীর তাৎপর্যময় এই ছড়া নিয়ে কোনো বিদগ্ধ পিএইচডি স্কলার কি তার ডক্টরেট বৈতরণী পেরোনোর কথা ভাবতে পারেন না? যাই হোক, বর্তমান সময় হলে দেশপ্রেমীর দল এই ছড়াকারকে নির্ঘাত পিটিয়ে মেরেফেরে ফেলতো কিন্তু সুখের বিষয়, হুমকি দিয়ে, মৃত্যুদণ্ড দিয়ে আর যাই হোক, কবিতার কণ্ঠরোধ করা যায় না...

Comments

  1. Etodin Khali vabtam kobita manei kichu durbodhdho kothar ekta joga khichuri (Obossoi Amar Moto niret nirvejal jontrer kache) kintu hotat ajk sei sob purono kotha gulo mone pore gelo... Ekta sotti kotha Ami bohubaar vebechi oi Pepsi wala chora Ra bolbo kintu keno jani na Babar voyei hok r somajer voyei (ditiyo ta ekhon besi pai) hok kokhono bole uthte Pari Ni... Thanks bro for sharing such a good stuff... :)

    ReplyDelete
  2. দারুণ ভালো লাগলো পুরানো দিনের স্মৃতি চারন মূলক গল্পটা পড়ে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

সুডুকু মেলানোর উপায়- নীলেশ

তোত্তো-চান : 'তোমোই গাকুয়েন' - একটি প্রকৃত বিদ্যালয় - শতাব্দী